
কোটচাঁদপুর শুধু একটি শহর নয়, এটি বাংলাদেশের এক ইতিহাসবহুল অধ্যায়। ঝিনাইদহ জেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শহরটির শেকড় প্রশস্ত মুঘল ও ব্রিটিশ শাসনামল পর্যন্ত। শহরটি একসময় ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিল, এবং আজও এর ইতিহাসের প্রতিটি ইট-পাথর সেই সমৃদ্ধ অতীতের গল্প বলে।
প্রাচীন কালের শহর
কোটচাঁদপুরের প্রতিষ্ঠা মুঘল সাম্রাজ্যের সময়ে। সম্রাট আকবরের শাসনামলে, দরবেশ সরদার চাঁদ খা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। তার নামানুসারে শহরটির নাম রাখা হয় চাঁদপুর। পরবর্তীতে যখন এখানে একটি কোর্ট স্থাপিত হয়, তখন শহরটির নাম পরিবর্তন করে কোর্টচাঁদপুর রাখা হয়। এই কোর্টচাঁদপুরই আজকের কোটচাঁদপুর, যা তার ঐতিহ্যবাহী ইতিহাসের উত্তরাধিকার বহন করে চলছে।
বাণিজ্য এবং শিল্পের কেন্দ্রবিন্দু
একসময় কোটচাঁদপুর ছিল বৃহত্তর যশোর জেলার একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র। কপোতাক্ষ নদীর তীরে অবস্থিত এই শহরটি বিখ্যাত ছিল তার চিনিকল, খেজুরের গুড় এবং চিনি উৎপাদনের জন্য। এই চিনির খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এখানে ইউরোপিয়ান নাগরিকদের চিনিকল স্থাপনের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য আরও বৃদ্ধি পায় এবং শহরটির অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। যদিও আজকের দিনে কপোতাক্ষ নদীর বাণিজ্যিক পরিবহন বন্ধ হয়ে গেছে, তবে শহরটির ঐতিহ্য আজও স্মৃতির পাতায় সমুজ্জ্বল।
ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি এবং শিক্ষা
কোটচাঁদপুরের প্রতিটি কোণায় ছড়িয়ে আছে অতীতের গল্প। ব্রিটিশ শাসনামলে প্রতিষ্ঠিত বহু পুরাতন ভবন আজও শহরের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছে। বিশেষ করে, কোটচাঁদপুর সরকারি মডেল পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় একটি ঐতিহাসিক ভবনে পরিচালিত হচ্ছে, যা ব্রিটিশ আমলে তৈরি করা হয়েছিল। এছাড়াও শহরে আছে বহু পুরোনো মসজিদ ও মন্দির, যা এখানকার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রতিফলিত করে।
শিক্ষাক্ষেত্রে কোটচাঁদপুর আজও অনেক এগিয়ে আছে। এখানে রয়েছে বেশ কিছু কলেজ, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়, যা এখানকার শিক্ষার মানকে উন্নত করছে। শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং মানবতার সেবায় এগিয়ে আসার ঐতিহ্য এই শহরটির গর্ব।
কৃষি ও অর্থনীতি
কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল কোটচাঁদপুরে রয়েছে প্রচুর কৃষিজমি। ধান, গম, পাট, এবং আখের পাশাপাশি, বর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে আম, পেয়ারা এবং ড্রাগন ফলের চাষ করা হচ্ছে। এছাড়াও, মৎস্য চাষ এখানকার অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে। শীতের সময় এই অঞ্চল বিখ্যাত খেজুর গুড়ের জন্য, যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হয়।
ভাষা ও সংস্কৃতি
কোটচাঁদপুরের ভাষা এবং সংস্কৃতিতে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার মিশ্রণ। এখানে আঞ্চলিক ভাষার সাথে যশোর এবং খুলনার ভাষার প্রভাব দেখা যায়। শহরটির মানুষজন আন্তরিক এবং সংস্কৃতিপ্রেমী। এখানকার উৎসবগুলো যেমন পূজা-পার্বণ, ঈদ, এবং অন্যান্য সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো প্রতিটি মানুষকে একত্রিত করে। কোটচাঁদপুরের মানুষের মিলন আর ঐক্যই শহরটির আসল সৌন্দর্য।
নদী এবং পর্যটন
কপোতাক্ষ এবং চিত্রা নদী কোটচাঁদপুরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে আরও মনোরম করে তুলেছে। নদীগুলোর তীরে একসময় গড়ে উঠেছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র, যা আজও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে থেকে গেছে। এছাড়া, বলুহর বাওড় পর্যটকদের আকর্ষণের একটি প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। এখানে স্থানীয় মানুষ এবং পর্যটকরা নৌকাভ্রমণ, মাছ ধরা, এবং পিকনিকে অংশ নিতে আসেন।